ভারতীয় পদ্ধতিতে রোগ পরীক্ষা

রোগ বিবেচনে হাতের নাড়ী পরীক্ষা;
রোগের প্রকৃতি বিবেচনার জন্য হাতের কব্জিতে থাকা নারীর অর্থাৎ হাতের মনিবন্ধে বৃদ্ধাঙ্গুলির মুলদেশে থাকা রক্তবাহী শিরার স্পন্দন বৈদরা নিরীক্ষণ করে থাকেন। 
পুরুষের দক্ষিন হাতের এবং স্ত্রীলোকের বাম হস্তের নারী পরীক্ষা করতে হয়। কোন মুমূর্ষ রোগীর হস্তস্থিত নাড়ী পরীক্ষা করা সম্ভব না হলে গুলফ গ্রন্থির নিম্ন দেশস্থ নাড়ী অথবা কন্ঠ, নাসিকা বা পদতলের নাড়ীর স্পন্দন দ্ধারাও রোগ নির্ণয় করা যেতে
পারে এজন্য অবশ্য বিশেষ অভিজ্ঞতার ও প্রয়োজন হয়।
রোগীর ঘুমন্ত অবস্থায় বা ঘুম থেকে উঠতেই, ভোজনকালে বা ভোজনের অব্যাহতি পরেই, বা ক্ষুধার্ত অবস্থায় কখনই নাড়ী পরীক্ষা করা ঠিক নয়, তাতে সঠিক ভাবে রোগ নিরুপন কখনই সম্ভব হয় না।
নাড়ীর স্পন্দন গতি: প্রতিটি সুস্থ মানুষের জন্মকাল থেকে 1 বৎসর বয়স পর্য্যন্ত নাড়ীর গতি প্রতি মিনিটে সাধারণত 120-140 বার হয়ে থাকে। 
2 বৎসর থেকে 5 বৎসর বয়স পর্য্যন্ত নাড়ীর গতি প্রতি মিনিটে সাধারণত 90-105 বার হয়ে থাকে।
6 বৎসর থেকে 15 বৎসর বয়স পর্য্যন্ত নাড়ীর গতি প্রতি মিনিটে সাধারণত 80-90 বার হয়ে থাকে। 
16 থেকে 60 বৎসর বয়স পর্য্যন্ত নাড়ীর গতি প্রতি মিনিটে সাধারণত 70-75 বার হয়ে থাকে। 
এবং বৃদ্ধ বয়সে নাড়ীর গতি সাধারণত প্রতি মিনিটে 50-60 বার হয়ে থাকে।
নাড়ীর স্পন্দনের তারতম্য বোধ: 
🔵একজন সুস্থ মানুষের নাড়ী কেঁচোর ন্যায় ধীরে ধীরে স্পন্দিত হয়। স্পন্দনে কোন প্রকার জড়তা অনুভব হয় না। সচরাচর প্রাতঃকালে নাড়ী স্নিগ্ধ, মধ্যাহ্নে উষ্ণ এবং অপরাহ্নে দ্রুতগতি সম্পন্ন হয়ে থাকে।
🔵এবং একজন অসুস্থ ব্যক্তির নাড়ী: 
👉বায়ু প্রভাবিত ব্যক্তির নাড়ী বক্রগতি সম্পন্ন সর্প সদৃশ বক্রিম গতিতে সম্পরসার মান হয়।
👉পিত্ত কুপিত ব্যক্তির নাড়ী লম্ফমান কাক বা ভেক সদৃশ লাফাইয়া লাফাইয়া চলে।
👉কফ প্রভাবিত ব্যক্তির নাড়ী স্থির সদৃশ , হাঁস বা কপোতের ন্যায় মন্দ মন্দ সঞ্চারমান হয়।
👉বায়ু ও পিত্তের দ্ধারা প্রভাবিত রোগীর নাড়ী সর্প ও ভেকের ন্যায় বক্র ও চঞ্চল হয়।
👉পিত্ত ও শ্লেষমার আধিক্য ঘটলে রোগীর নাড়ী কখনো সর্প ও কখনও হংসের ন্যায় মন্দ গতির হয়।
👉বায়ু ও শ্লেষমার আধিক্য ঘটলে নাড়ীর গতি সর্প সদৃশ বক্র গতি আবার কখনো রাজ হংসের ন্যায় মন্দ গতির হয়।
👉সন্নিপাত জনিত কারণে নাড়ী ত্রিদোষযুক্ত হইলে নাড়ী কখনও ভীষণ প্রকম্পিত কখনও ক্ষীণ গতি সম্পন্ন আবার কখনো চলমান অবস্থায় স্তব্দ হয়ে থাকে।
🏐বিবিধ রোগে নাড়ী পরীক্ষা: 
জ্বরে নাড়ী উষ্ণ, ও দ্রুতগতি সম্পন্ন হয়। উদরাময় বা পেটের রোগে নাড়ী শীতল ও দুর্বল অনুভূত হয়। পুরাতন রোগে নাড়ী কখনো স্থূল ও কখনো দ্রুত গতি সম্পন্ন হয়। অজীর্ণ রোগে নাড়ী সচরাচর স্থূল গতি সম্পন্ন হয়। কলেরায় নাড়ী দুর্বল ও স্তব্দ মনে হয়। কৃমি রোগে নারী স্থূল, মৃদু ও দ্রুত গতি সম্পন্ন হয়। রক্তস্রাব জনিত কারণে নাড়ী ক্ষীণ, চঞ্চল, ধীর ও মৃদুগতি যুক্ত হয়। যক্ষা রোগে নাড়ী মৃদু ও দুর্বল হয়। কাশ রোগে নাড়ী দ্রুত অনিয়মিত ভাবে প্রবাহিত হয়ে থাকে। শ্বাস রোগে নাড়ী কখনও দ্রুত কখনো মৃদুমন্দ গতি সম্পন্ন হয়। বিষম জ্বরে নাড়ী স্থিরভাবে সঞ্চারমান হয়। সর্দি রোগে নাড়ী ধীর, মৃদুমন্দ বা কখনো চঞ্চল হয়। ত্রিবিধ জ্বরে নাড়ী ভ্রমরগতি সম্পন্ন হয়। কামজ্বরে নাড়ীর গতি চঞ্চল হয়। ক্রোধজ্বরে নাড়ীর গতি দ্রুত হয়। মূত্রকরিচ্ছ রোগে নাড়ীর গতি স্থূল হয়। বাত ও শুল রোগে নাড়ীর গতি অতীব বক্রগতি সম্পন্ন হয়। প্রমেহ ও উপদংশে নাড়ীর গতি মাঝে মাঝে বাধা গ্রস্ত হয়। অস্ত্রাঘাতে নাড়ীর গতি হংস ও গজ সদৃশ হয়। মলরোধ ঘটিলে নাড়ী ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে। স্ত্রী সম্ভোগের পর নাড়ী তীব্র ও সরলগতি সম্পন্ন হয়। ঐকাহিক জ্বরে নাড়ী থাকিয়া থাকিয়া চলে। বায়ু ও পিত্ত জ্বরে নাড়ী চঞ্চল, স্থূল , কঠিন দোলায়মান অবস্থায় সঞ্চারমান হয়। বাত ও শ্লেষ্মা জ্বরে নাড়ী মৃদুমন্দ গতিতে ধাবমান হয় ও ঈষদুষ্ণ হয়। পিত্ত শ্লেষ্মা জ্বরে নাড়ী কৃশ এবং সময়ে সময়ে শীতল ও মৃদুমন্দ গতি সম্পন্ন হয়। বিষভক্ষনে বা সর্প দংশনে নাড়ীর গতি অত্যন্ত অস্থির হয়ে থাকে।
বিশেষ: বায়ুতে দূষিত, পিত্তে দগ্ধ এবং কফে কুপিত নাড়ী মৃত্যু সূচক হয়।
রোগ নিরূপণে চক্ষু পরীক্ষা: আপনার রোগ যদি বায়ু প্রকুপিত হয় তাহলে চক্ষুতারাদ্ধয় ঘূর্ণায়মান, চঞ্চল, ধূমরবত রুক্ষ, মধ্যভাগ হলুদ, ও রক্তবর্ণ হয়ে থাকে।
পিত্ত প্রকুপিত রোগে চক্ষুদ্ধয় রক্তবর্ণ ও হলুদ হয় সেই সাথে চক্ষুতে জ্বালা বোধ হয়।
কোন রোগ কফ প্রকুপিত হইলে চক্ষু জলপূর্ণ, স্নিগধ, শ্বেত বর্ন, ও জ্যোতিশূন্য হয়ে থাকে।
আর রোগ যদি ত্রিদোষে প্রকুপিত হয় তাহলে চক্ষু কৃষ্ণ ও রক্তবর্ণ হয়, বক্রদৃষ্টি সম্পন্ন এবং চক্ষুতে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব বিদ্যমান থাকে।

রোগ নিরূপণে জিহবা পরীক্ষা: বায়ু পীড়িত রোগীর জিহবা সচরাচর পীতবর্ন, রুক্ষ ও ফাটা ফাটা দৃষ্ট হয়।
পিত্ত পীড়িত রোগীর জিহবা রক্তবর্ণ নতুবা শ্যাম বর্ন বিশিষ্ট হয়।
শ্লেষ্মা দ্ধারা পীড়িত রোগীর জিহবা শ্বেত , আদ্র, কর্কশ, স্ফটোক যুক্ত, ও দধিবত দৃষ্ট হয়ে থাকে ।
জ্বর ও দাহ রোগগ্রস্ত ব্যক্তির জিহবা সচরাচর রসশূন্য হয়ে থাকে।
প্রবল দাহ রোগে, নব জ্বরে, আমাজিরনে , আমবাতে জিহবা শ্বেত বর্ন, ও শ্লেষ্মা যুক্ত হয়।
সন্নিপতিক জ্বরে জিহবা খসখসে কর্কশ ভাব যুক্ত হয়।
যকৃৎ বা পিত্ত বিকারে এবং ক্ষয় রোগে জিহ্বাতে ক্ষত সৃষ্টি হয়।
ওলাউঠা , মূর্ছা এবং শ্বাস রোগে জিহবা সচরাচর শীতল বোধ হয়।